সকল সরকারি চাকরির তথ্য সবার আগে মোবাইলে নোটিফিকেশন পেতে ডাউনলোড করুন
Android App: Jobs Exam Alert

বর্তমান সময়ে চাকরিপ্রার্থীদের মনে এটিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। তবে আবেগের বশবর্তী না হয়ে, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের তাকাতে হবে পরীক্ষার পদ্ধতি, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং প্রশাসনিক বাস্তবতার দিকে।

১১ লাখ পরীক্ষার্থী ও লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ আমরা যতটা সহজ ভাবছি, প্রায় ১১ লাখ পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা নেওয়া আসলে ততটা সহজ নয়। সারা বাংলাদেশে একই সময়ে, একই দিনে এত বিশাল সংখ্যক প্রার্থীর পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা একটি মহাযজ্ঞ। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (DPE) বর্তমান অবকাঠামো এবং জনবল দিয়ে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্তভাবে পরিচালনা করা প্রায় অসম্ভব। বাস্তবতা হলো, এই অধিদপ্তর যতবারই ১১ লাখ প্রার্থীর পরীক্ষা নেবে, ততবারই কম-বেশি দুর্নীতি বা অব্যবস্থাপনার চিত্র উঠে আসবে। কারণ সমস্যাটা শুধু পরীক্ষায় নয়, সমস্যাটা গোড়ায়—অর্থাৎ ব্যবস্থাপনায়।

কেন প্রশ্নফাঁস হয়নি, কিন্তু দুর্নীতি হয়েছে?এবারের পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র পরীক্ষার আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়নি। এর মূল কৃতিত্ব নতুন জেলা প্রশাসকদের (DC)। তারা নিজেদের সম্মান ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে প্রশ্ন পরিবহনে কঠোর নজরদারি করেছেন। কোনো জেলায় প্রশ্ন ফাঁস হলে সেটি সংশ্লিষ্ট ডিসির জন্য অপমানজনক হতো, তাই তারা সতর্ক ছিলেন।

কিন্তু প্রশ্নপত্র রক্ষা করা গেলেও পরীক্ষা কেন্দ্রের ভেতরের পরিবেশ রক্ষা করা যায়নি। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর মূলত জেলা ও উপজেলা শহরের বিভিন্ন স্কুল-কলেজকে কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে। আর এই কেন্দ্রগুলোই হলো দুর্নীতির আঁতুড়ঘর।

কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তির অভাব সারা দেশের হাজার হাজার কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা, মেটাল ডিটেক্টর এবং জ্যামার বসিয়ে পরীক্ষা নেওয়ার মতো সক্ষমতা বা বাজেট প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নেই।

  • দুর্বল চেকিং: ৯৯% কেন্দ্রে পরীক্ষার্থীদের প্রবেশের সময় যথাযথভাবে তল্লাশি করা হয় না। ১১ লাখ পরীক্ষার্থীর কান চেক করে ইলেকট্রনিক ডিভাইস শনাক্ত করার মতো জনবল বা প্রযুক্তি কর্তৃপক্ষের নেই।
  • সংশ্লিষ্টদের অসাধুতা: অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, কেন্দ্রের দায়িত্বরত শিক্ষক বা কর্মচারীরাই দুর্নীতির সাথে জড়িত। যেখানে রক্ষকই ভক্ষক, সেখানে সুষ্ঠু পরীক্ষা আশা করা বিলাসিতা।

তাই এই ‘ভঙ্গুর ব্যবস্থাপনা’ জিইয়ে রেখে অধিদপ্তর যদি ১০০০ বারও পরীক্ষা নেয়, ফলাফল একই হবে। প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কেন্দ্রের আমূল সংস্কার ছাড়া সুষ্ঠু পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব নয়।

পরীক্ষা কি বাতিল হবে? বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পরীক্ষা বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। এর পেছনে বড় কারণ হলো ‘নির্বাচন’। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর যেকোনো মূল্যে নির্বাচনের আগেই এই বিশাল নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার মানসিকতা নিয়ে এগোচ্ছে। তাদের এই তাড়াহুড়োর পেছনের কারণ অনেকের কাছেই অস্পষ্ট। প্রশাসন চায় না নির্বাচনের আগে নিয়োগ প্রক্রিয়া ঝুলে থাকুক বা নতুন কোনো জটিলতা সৃষ্টি হোক।

যদি আন্দোলন তীব্র হয় তবে কী হতে পারে? যদি পরীক্ষার্থীদের আন্দোলনের চাপে অধিদপ্তর নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়, তবে হয়তো পুরো পরীক্ষা বাতিল না-ও হতে পারে। সেক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক প্রার্থীকে টিকিয়ে (শর্ট লিস্ট করে) তাদের আবার লিখিত বা এমসিকিউ (MCQ) পরীক্ষা নেওয়া হতে পারে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে মনে হচ্ছে না যে অধিদপ্তর এমন কোনো বড় চাপের মুখে আছে। তারা তাদের পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ীই এগোচ্ছে।

চুপ থাকার সংস্কৃতি ও ভবিষৎঃ যুগের পর যুগ ধরে এই অনিয়ম চলে আসছে। প্রতিটি পরীক্ষার পর কর্তৃপক্ষের দায়সারা বক্তব্য ছাড়া এই জাতি আর কিছুই পায়নি। চাকরিপ্রার্থীরা যদি এই জরাজীর্ণ সিস্টেম এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে এখনই সোচ্চার না হন, তবে এই সমস্যা সমাধান হতে আরও কয়েক যুগ লেগে যাবে। কেবল পরীক্ষা বাতিল বা পুনর্পরীক্ষা দাবি নয়, বরং প্রয়োজন পুরো পরীক্ষা পদ্ধতির আধুনিকায়ন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি তোলা।

সাধারণ চাকরিপ্রার্থীদের দাবি হওয়া উচিতঃ

১. স্বতন্ত্র প্রশ্ন প্রণয়ন ও ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর:
চাকরির পরীক্ষার প্রশ্ন প্রণয়ন, ছাপানো এবং বিতরণের জন্য সম্পূর্ণ স্বাধীন ও শক্তিশালী একটি অধিদপ্তর বা কমিশন গঠন করতে হবে। অন্য কোনো সংস্থার হাতে এই দায়িত্ব রাখা যাবে না।

২. প্রশ্ন প্রণেতাদের ‘আইসোলেশন’ বা যোগাযোগ বিচ্ছিন্নকরণ:
প্রশ্ন তৈরি থেকে শুরু করে পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত, এই প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত সকল ব্যক্তিকে (কর্মকর্তা-কর্মচারী) বাইরের পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রাখতে হবে। তাদের মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ থাকবে এবং তারা একটি নির্দিষ্ট ‘সিকিউর জোন’ বা আইসোলেশনে থাকবেন। পুরো এলাকাটি সিসিটিভি এবং জ্যামার প্রযুক্তির আওতায় থাকবে। সাংবাদিকরা বিল্ডিংয়ের বাইরে পাহারায় থাকবেন। এর পরেও প্রশ্নফাঁসের প্রমাণ হলে, এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তির বিধান করতে হবে।

৩. স্মার্ট লক ও ডিজিটাল প্যাকেজিং:
প্রশ্নপত্রের প্যাকেজিংয়ে আধুনিক ‘স্মার্ট লক’ প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। এই লক নির্দিষ্ট সময়ের আগে খোলা সম্ভব হবে না এবং খোলার চেষ্টা করলে অটোমেটিক সিগন্যাল বা অ্যালার্ট দেবে। শুধুমাত্র পরীক্ষার্থীদের সামনে পরীক্ষা কেন্দ্রে এই প্যাকেট খোলা হবে নির্দিষ্ট সময়ে।

৪. কেন্দ্র কর্মকর্তাদের ওপর কঠোর নজরদারি:
পরীক্ষা চলাকালীন শিক্ষক, কর্মচারী, বা ম্যাজিস্ট্রেট—যেই কেন্দ্রে প্রবেশ করবেন, পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তারা কেন্দ্র থেকে বের হতে পারবেন না এবং মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারবেন না।

৫. সিসি ক্যামেরা ও লাইভ মনিটরিং:
প্রতিটি পরীক্ষা কেন্দ্র সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে। সকল ফুটেজ রেকর্ড করা হবে। স্বচ্ছতার স্বার্থে পরীক্ষা শেষে প্রয়োজনে ভিডিও ফুটেজ অনলাইনে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে। ভাইভা পরীক্ষার ক্ষেত্রেও ভিডিও রেকর্ড রাখতে হবে এবং ভাইভায় নম্বরের ব্যবধান কমিয়ে আনতে হবে যাতে স্বেচ্ছাচারিতা না হয়।

৬. জ্যামার প্রযুক্তি ও ডিভাইস নিয়ন্ত্রণ:
প্রতিটি কেন্দ্রে শক্তিশালী জ্যামার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে, যাতে কোনোভাবেই ইলেকট্রনিক ডিভাইসের মাধ্যমে জালিয়াতি করা না যায়।

অধিকতর স্বচ্ছতার জন্য বিকল্প প্রস্তাবনা (প্রয়োজনে প্রয়োগযোগ্য):

যদি স্থানীয় প্রভাবে দুর্নীতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে:

  • কেন্দ্রমুক্ত পরীক্ষা (Cross-District Center): এক জেলার পরীক্ষার্থীদের কেন্দ্র পাশের অন্য জেলায় ফেলা যেতে পারে। এতে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো অসম্ভব হবে।
  • প্রশাসনিক রদবদল (Duty Swap): পরীক্ষার দিন এক জেলার প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের অন্য জেলায় ডিউটি দেওয়া হবে, যাতে কোনো পূর্ব পরিচিতি বা আঁতাত কাজ না করে।

আমাদের প্রধান দাবি: সকল চাকরির পরীক্ষা জেলা শহরে নিতে হবে
একজন বেকার প্রার্থীর পক্ষে প্রতি সপ্তাহে ঢাকায় গিয়ে পরীক্ষা দেওয়া আর্থিক ও মানসিকভাবে অসম্ভব। এমনকি মেয়েদের ক্ষেত্রে একা একা ঢাকায় গিয়ে প্রতিনিয়ত পরীক্ষা দেওয়া অনেক কষ্টের। এছাড়া নিরাপত্তার ঝুকি এবং পারিবারিক চাপ তো আছেই। তাই অবিলম্বে সকল চাকরির পরীক্ষা নিজ জেলা শহরে অথবা বিভাগীয় শহরে বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। উপরের নিয়ম গুলো ফলো করে জেলা শহরে পরীক্ষা নিলে কোন সমস্যা হবে না।  

সর্বশেষ কথা, সন্তান না কাঁদলে মা-ও দুধ দেয় না। আর তো সাধারণ চাকরিপ্রার্থী। যতদিন পর্যন্ত চাকরিপ্রার্থীরা নিজেদের অধিকারের জন্য নিজেরাই মাঠে না দাঁড়াবে, ততদিন এটাই চলতে থাকবে।

আপনার করণীয় কী?

আমাদের এই আন্দোলন কেবল ফেসবুকে লাইক দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। আমাদের আওয়াজ পৌঁছাতে হবে নীতিনির্ধারকদের কানে। তাই এখনই যুক্ত হোন আমাদের মূল প্ল্যাটফর্মে:

 আন্দোলন ও আলোচনার জন্য ফেসবুক গ্রুপ:

https://www.facebook.com/groups/824139897276763

(গ্রুপে জয়েন করে আপনার মতামত, পরামর্শ এবং পরিস্থিতি তুলে ধরুন)