বারবার একই চিত্রনাট্য, বারবার একই প্রহসন! বেকারত্বের অভিশাপ মাথায় নিয়ে একটু স্বচ্ছলতার আশায় থাকা দেশের লাখ লাখ তরুণের সাথে একের পর এক এ কেমন তামাশা চলছে? আজ সকাল ১১টায় যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল। দেশের নানা প্রান্ত থেকে তিন লাখেরও বেশি চাকরিপ্রার্থী পকেটের শেষ সম্বলটুকু খরচ করে, রাতের পর রাত বাসে-ট্রেনে ঝুলে ঢাকায় এলেন। কিন্তু পরীক্ষার কেন্দ্রে পৌঁছানোর পর তাদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল, তারা জানতে পারলেন— পরীক্ষা বাতিল! কারণ সেই পুরনো ও জঘন্য ব্যাধি, 'প্রশ্নফাঁস'।
প্রশ্ন হলো— এই তামাশা দেখার কি কেউ নেই?
আজ যে তিন লাখ প্রার্থী দেশের নানা প্রান্ত থেকে রাতের পর রাত জেগে, বাসের টিকিট না পেয়েও কষ্ট করে ঢাকায় এসেছেন, তাদের যাতায়াত, থাকা-খাওয়া বাবদ জনপ্রতি যদি ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকাও খরচ হয়, তবে এই তিন লাখ বেকারের পকেট থেকে যে প্রায় ৪৫ থেকে ৬০ কোটি টাকা এক রাতের মধ্যে নাই হয়ে গেল, এর দায়ভার কে নেবে? দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা তো ২৫ লাখ টাকার চুক্তিতে পকেট ভারী করছেন, কিন্তু কৃষক বাবার ধার করা টাকায়, টিউশনির জমানো টাকায় ঢাকায় আসা এই বেকার যুবকদের ক্ষতিপূরণ কে দেবে?
সবচেয়ে বড় আক্ষেপের জায়গা হলো আমাদের বর্তমান প্রেক্ষাপট। এই দেশের তরুণেরা, ছাত্রসমাজ বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে, জীবন বাজি রেখে একটা সরকার পতন ঘটিয়েছে। কেন? কারণ তারা একটা দুর্নীতিমুক্ত, বৈষম্যহীন এবং মেধার মূল্যায়ন হয় এমন একটি 'নতুন বাংলাদেশ' চেয়েছিল। কিন্তু সরকার পরিবর্তন হলেও সিস্টেমের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে থাকা এই দুর্নীতির ক্যানসারগুলো কেন দূর হচ্ছে না? কেন দেশ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখা তরুণদের বারবার একই ফাঁদে পড়তে হচ্ছে?
শুধুমাত্র পরীক্ষা স্থগিত বা বাতিল করা কোনো সমাধান নয়। পরীক্ষা বাতিল করে দুর্নীতিবাজদের বাঁচিয়ে দেওয়ার এই সংস্কৃতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। আমরা চাই এই সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধান।
আর শাস্তির কথা উঠলেই সেই পুরনো গৎবাঁধা বুলি— "দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে"। এই 'দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি'র নামে যুগ যুগ ধরে দেশে আমলারা দুর্নীতির এক বিশাল সাম্রাজ্য তৈরি করেছে। আমরা জানি এই নাটকের স্ক্রিপ্ট কী! লোক দেখানো একটা তদন্ত কমিটি হবে, কয়েকদিন পর রিপোর্ট ধামাচাপা পড়বে, আর বদলি বা সাময়িক বরখাস্তের আইওয়াশ শেষে এই দুর্নীতিবাজরাই আবার সসম্মানে ফিরে এসে নতুন কোনো চুরির ছক কষবে। এই বস্তাপচা সিস্টেম আর ফাঁকা বুলি দেশের তরুণ সমাজ আর শুনতে চায় না।
আমরা চাই প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দেওয়া হোক।
সাধারণ চাকরিপ্রার্থীদের দাবি হওয়া উচিতঃ
১. স্বতন্ত্র প্রশ্ন প্রণয়ন ও ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর:
চাকরির পরীক্ষার প্রশ্ন প্রণয়ন, ছাপানো এবং বিতরণের জন্য সম্পূর্ণ স্বাধীন ও শক্তিশালী একটি অধিদপ্তর বা কমিশন গঠন করতে হবে। অন্য কোনো সংস্থার হাতে এই দায়িত্ব রাখা যাবে না।
২. প্রশ্ন প্রণেতাদের ‘আইসোলেশন’ বা যোগাযোগ বিচ্ছিন্নকরণ:
প্রশ্ন তৈরি থেকে শুরু করে পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত, এই প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত সকল ব্যক্তিকে (কর্মকর্তা-কর্মচারী) বাইরের পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রাখতে হবে। তাদের মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ থাকবে এবং তারা একটি নির্দিষ্ট ‘সিকিউর জোন’ বা আইসোলেশনে থাকবেন। পুরো এলাকাটি সিসিটিভি এবং জ্যামার প্রযুক্তির আওতায় থাকবে। সাংবাদিকরা বিল্ডিংয়ের বাইরে পাহারায় থাকবেন। এর পরেও প্রশ্নফাঁসের প্রমাণ হলে, এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তির বিধান করতে হবে।
৩. স্মার্ট লক ও ডিজিটাল প্যাকেজিং:
প্রশ্নপত্রের প্যাকেজিংয়ে আধুনিক ‘স্মার্ট লক’ প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। এই লক নির্দিষ্ট সময়ের আগে খোলা সম্ভব হবে না এবং খোলার চেষ্টা করলে অটোমেটিক সিগন্যাল বা অ্যালার্ট দেবে। শুধুমাত্র পরীক্ষার্থীদের সামনে পরীক্ষা কেন্দ্রে এই প্যাকেট খোলা হবে নির্দিষ্ট সময়ে।
৪. কেন্দ্র কর্মকর্তাদের ওপর কঠোর নজরদারি:
পরীক্ষা চলাকালীন শিক্ষক, কর্মচারী, বা ম্যাজিস্ট্রেট—যেই কেন্দ্রে প্রবেশ করবেন, পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তারা কেন্দ্র থেকে বের হতে পারবেন না এবং মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারবেন না।
৫. সিসি ক্যামেরা ও লাইভ মনিটরিং:
প্রতিটি পরীক্ষা কেন্দ্র সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে। সকল ফুটেজ রেকর্ড করা হবে। স্বচ্ছতার স্বার্থে পরীক্ষা শেষে প্রয়োজনে ভিডিও ফুটেজ অনলাইনে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে। ভাইভা পরীক্ষার ক্ষেত্রেও ভিডিও রেকর্ড রাখতে হবে এবং ভাইভায় নম্বরের ব্যবধান কমিয়ে আনতে হবে যাতে স্বেচ্ছাচারিতা না হয়।
৬. জ্যামার প্রযুক্তি ও ডিভাইস নিয়ন্ত্রণ:
প্রতিটি কেন্দ্রে শক্তিশালী জ্যামার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে, যাতে কোনোভাবেই ইলেকট্রনিক ডিভাইসের মাধ্যমে জালিয়াতি করা না যায়।
অধিকতর স্বচ্ছতার জন্য বিকল্প প্রস্তাবনা (প্রয়োজনে প্রয়োগযোগ্য):
যদি স্থানীয় প্রভাবে দুর্নীতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে:
আমাদের প্রধান দাবি: সকল চাকরির পরীক্ষা জেলা শহরে নিতে হবে
একজন বেকার প্রার্থীর পক্ষে প্রতি সপ্তাহে ঢাকায় গিয়ে পরীক্ষা দেওয়া আর্থিক ও মানসিকভাবে অসম্ভব। এমনকি মেয়েদের ক্ষেত্রে একা একা ঢাকায় গিয়ে প্রতিনিয়ত পরীক্ষা দেওয়া অনেক কষ্টের। এছাড়া নিরাপত্তার ঝুকি এবং পারিবারিক চাপ তো আছেই। তাই অবিলম্বে সকল চাকরির পরীক্ষা নিজ জেলা শহরে অথবা বিভাগীয় শহরে বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। উপরের নিয়ম গুলো ফলো করে জেলা শহরে পরীক্ষা নিলে কোন সমস্যা হবে না।
সর্বশেষ কথা, সন্তান না কাঁদলে মা-ও দুধ দেয় না। আর তো সাধারণ চাকরিপ্রার্থী। যতদিন পর্যন্ত চাকরিপ্রার্থীরা নিজেদের অধিকারের জন্য নিজেরাই মাঠে না দাঁড়াবে, ততদিন এটাই চলতে থাকবে।