১ জুলাই থেকে 'বাংলা কিউআর' (Bangla QR) সিস্টেম চালু হলেও, এটি যেভাবে গতি পাওয়ার কথা ছিল, তার চেয়ে বরং মানুষকে বেশি হতাশ করছে। এর মূল কারণ হলো লেনদেনের ফি বা চার্জ।

ব্যবসা মানেই একটি চরম প্রতিযোগিতা। 'বাংলা কিউআর'-এর মাধ্যমে পেমেন্ট গ্রহণ করলে দোকানদারকে ১% ফি দিতে হবে। এর মানে হলো, দিনে যদি ৫০ হাজার টাকা বিক্রি হয়, তবে তাকে প্রায় ৫০০ টাকা ফি গুনতে হবে। অথচ, তিনি যদি নগদে (ক্যাশে) টাকা নেন, তবে এই ৫০০ টাকা তাঁর লাভ হিসেবেই থেকে যাবে। হিসাব করলে দেখা যায়, এতে একজন ব্যবসায়ীর মাসে ১৫,০০০ টাকা এবং বছরে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার টাকার মতো ক্ষতি হবে। জেনে-শুনে বছরে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা ক্ষতি করার মতো বোকামি কে করবে? আরো মজার বিষয় অনেক প্রোডাক্ট মার্কেটে আছে যার লাভ ১% হবেও না। সেইটা নিতে ১% ফি দিতে হবে। পাইকারি বাজারের চিন্তা করলে উল্টো তাদের নিজের ক্যাশ থেকে দিতে হবে। ব্যবসার জায়গায় ব্যবসাই প্রধান, তাই এই সিস্টেম অচিরেই মুখ থুবড়ে পড়বে।

অথচ, বাংলাদেশের জন্য ক্যাশলেস বা নগদবিহীন লেনদেন ব্যবস্থা এখন অত্যন্ত প্রয়োজন। তাই এই সিস্টেমটি শুরু থেকেই সম্পূর্ণ ফ্রি বা চার্জমুক্ত করা উচিত ছিল। এতে দেশের অর্থনীতিতে একটি বড় পরিবর্তন আসত এবং সরকার বছরে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব পেত।

১% ফি না নিলে সরকার কীভাবে রাজস্ব পাবে? হিসাবটি একদম সহজ। যখন সমস্ত লেনদেন ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে হবে, তখন একজন দোকানদার বছরে কত টাকা বিক্রি করছেন বা কত টাকা লাভ করছেন, তার পুরো হিসাব সরকারের কাছে থাকবে। ফলে তিনি চাইলেও আর ইনকাম ট্যাক্স বা আয়কর ফাঁকি দিতে পারবেন না। এছাড়া, আমরা যখন বড় বড় শোরুম থেকে কিছু কিনি এবং ১৫% ভ্যাট দিই, অনেক সময় সেই ভ্যাটের টাকায় নয়ছয় হয়। ডিজিটাল ট্রানজেকশনে এই নয়ছয় করার সুযোগ আর থাকবে না।

সবার জন্য কিউআর পেমেন্ট: শুধু ব্যবসায়ীদের জন্যই নয়, প্রতিটি নাগরিকের জন্য কিউআর (QR) সিস্টেম উন্মুক্ত করা উচিত। যাঁদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে, তাঁরা যেন কিউআর কোড স্ক্যান করে একে অপরকে সহজে টাকা পাঠাতে পারেন। এতে দেশের প্রতিটি টাকার সুনির্দিষ্ট হিসাব থাকবে এবং বছরে কোটি কোটি টাকার অতিরিক্ত ট্যাক্স সরকারের কোষাগারে জমা হবে।

এক ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংকে টাকা স্থানান্তর করতে ডিজিটাল সিস্টেমে কার্যত কোনো খরচই হয় না। সেখানে ১% ফি কেটে নেওয়ার ব্যবস্থা করে এত বড় ও গুরুত্বপূর্ণ একটি সিস্টেমকে অকেজো করে দেওয়ার কোনো মানেই হয় না। সরকার রেলওয়েসহ বিভিন্ন খাতে বছরে কোটি কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়। সেখানে দেশের অর্থনীতিকে স্বচ্ছ করার এই মাধ্যমটিকে সচল রাখতে সামান্য একটি সিস্টেম সরকার নিজ খরচে চালাতে পারবে না—এটা কোনো যুক্তির মধ্যেই পড়ে না।

দ্রুত এই ফি-সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান করতে না পারলে, 'বাংলা কিউআর' সিস্টেমটি পুরোপুরি মুখ থুবড়ে পড়বে এবং এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি চরম বাজে সিদ্ধান্ত হিসেবেই গণ্য হবে।

ক্যাশলেস সমাজ গঠনে বাংলাদেশ ব্যাংকের অপরিপক্বতা (বাংলা কিউআর)

চাকরির আপডেট পেতে ইনস্টল করুন