বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার নিশ্চিত করা নিঃসন্দেহে জরুরি, কিন্তু দেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান ও চাকরির পরীক্ষার স্বচ্ছতা কি তার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ? সম্প্রতি ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের জন্য ৭১ কোটি ৯৮ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অথচ, যে তরুণরা রক্ত দিয়ে দেশ সংস্কারের সুযোগ তৈরি করে দিল, সেই ‘জুলাইয়ের কারিগর’ বা বেকার যুবকদের চাকরির পরীক্ষার নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারের উদ্যোগ কতটুকু—সেই প্রশ্ন এখন প্রবল হয়ে উঠেছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্যানুযায়ী, আসন্ন নির্বাচনের ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে নজরদারির জন্য প্রায় ৭২ কোটি টাকা খরচ করা হচ্ছে। এই বিপুল অর্থ ব্যয়ের উদ্দেশ্য হলো ভোট চুরি রোধ করা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দেশের লাখ লাখ বেকার যুবক যখন চাকরির পরীক্ষার ফিস জোগাড় করতে হিমশিম খায়, তখন তাদের মেধা চুরির রোধে বাজেট কোথায়?
ভোট ৫ বছরে একবার আসে, কিন্তু একজন বেকারের প্রতিটি দিন কাটে অনিশ্চয়তায়। ভোটের ফলের চেয়েও একজন পরীক্ষার্থীর কাছে চাকরির পরীক্ষার ফলাফল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর সাথে জড়িয়ে আছে একটি পরিবারের বেঁচে থাকা। রাষ্ট্র যদি ভোটের বাক্সের পাহারায় কোটি কোটি টাকা খরচ করতে পারে, তবে মেধার পাহারায় কেন কার্পণ্য করবে?
অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, চাকরির পরীক্ষা মানেই প্রশ্নফাঁস, ডিজিটাল জালিয়াতি এবং প্রক্সি বা ভুয়া পরীক্ষার্থী সিন্ডিকেট। ব্লুটুথ ডিভাইস, কানের ভেতরে ক্ষুদ্র ইয়ারফোন ব্যবহার করে জালিয়াতির ঘটনা এখন নিত্যনৈমিত্তিক।
বেকারদের আশঙ্কা, ভোটের নিরাপত্তায় প্রযুক্তি ব্যবহার হলেও চাকরির পরীক্ষায় যদি জ্যামার ও সিসিটিভি নিশ্চিত না করা হয়, তবে নির্বাচন পরবর্তী সময়ে নিয়োগ পরীক্ষায় সেই পুরোনো দুর্নীতিই ফিরে আসবে।
২০২৪-এর জুলাই মাসে ছাত্র-জনতার যে অভ্যুত্থান হয়েছিল, তার মূল কারিগর ছিল এই তরুণ প্রজন্ম। তাদের বুকের রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে স্বৈরাচারী ব্যবস্থার পতন হয়েছে এবং বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। এই তরুণদের মূল দাবি ছিল—কোটা সংস্কার, মেধার মূল্যায়ন এবং দুর্নীতির অবসান।
কিন্তু সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর বেকাররা কী পেল?
জুলাইয়ের যোদ্ধারা যদি দেখেন যে, তাদের ত্যাগের বিনিময়ে আসা সরকার ভোটের বাক্স নিয়ে যতটা চিন্তিত, তাদের ভাতের ব্যবস্থা বা মেধার নিরাপত্তা নিয়ে ততটা নয়—তবে তা হবে মর্মান্তিক।
বেকার সমাজের আর্তনাদ সরকারের কানে পৌঁছাতে হলে কেবল মৌখিক আশ্বাস যথেষ্ট নয়। স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার জন্য অবিলম্বে নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়া জরুরি:
১. স্বতন্ত্র প্রশ্ন প্রণয়ন ও ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর:
চাকরির পরীক্ষার প্রশ্ন প্রণয়ন, ছাপানো এবং বিতরণের জন্য সম্পূর্ণ স্বাধীন ও শক্তিশালী একটি অধিদপ্তর বা কমিশন গঠন করতে হবে। অন্য কোনো সংস্থার হাতে এই দায়িত্ব রাখা যাবে না।
২. প্রশ্ন প্রণেতাদের ‘আইসোলেশন’ বা যোগাযোগ বিচ্ছিন্নকরণ:
প্রশ্ন তৈরি থেকে শুরু করে পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত, এই প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত সকল ব্যক্তিকে (কর্মকর্তা-কর্মচারী) বাইরের পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রাখতে হবে। তাদের মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ থাকবে এবং তারা একটি নির্দিষ্ট ‘সিকিউর জোন’ বা আইসোলেশনে থাকবেন। পুরো এলাকাটি সিসিটিভি এবং জ্যামার প্রযুক্তির আওতায় থাকবে। সাংবাদিকরা বিল্ডিংয়ের বাইরে পাহারায় থাকবেন। এর পরেও প্রশ্নফাঁসের প্রমাণ হলে, এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তির বিধান করতে হবে।
৩. স্মার্ট লক ও ডিজিটাল প্যাকেজিং:
প্রশ্নপত্রের প্যাকেজিংয়ে আধুনিক ‘স্মার্ট লক’ প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। এই লক নির্দিষ্ট সময়ের আগে খোলা সম্ভব হবে না এবং খোলার চেষ্টা করলে অটোমেটিক সিগন্যাল বা অ্যালার্ট দেবে। শুধুমাত্র পরীক্ষার্থীদের সামনে পরীক্ষা কেন্দ্রে এই প্যাকেট খোলা হবে নির্দিষ্ট সময়ে।
৪. কেন্দ্র কর্মকর্তাদের ওপর কঠোর নজরদারি:
পরীক্ষা চলাকালীন শিক্ষক, কর্মচারী, বা ম্যাজিস্ট্রেট—যেই কেন্দ্রে প্রবেশ করবেন, পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তারা কেন্দ্র থেকে বের হতে পারবেন না এবং মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারবেন না।
৫. সিসি ক্যামেরা ও লাইভ মনিটরিং:
প্রতিটি পরীক্ষা কেন্দ্র সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে। সকল ফুটেজ রেকর্ড করা হবে। স্বচ্ছতার স্বার্থে পরীক্ষা শেষে প্রয়োজনে ভিডিও ফুটেজ অনলাইনে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে। ভাইভা পরীক্ষার ক্ষেত্রেও ভিডিও রেকর্ড রাখতে হবে এবং ভাইভায় নম্বরের ব্যবধান কমিয়ে আনতে হবে যাতে স্বেচ্ছাচারিতা না হয়।
৬. জ্যামার প্রযুক্তি ও ডিভাইস নিয়ন্ত্রণ:
প্রতিটি কেন্দ্রে শক্তিশালী জ্যামার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে, যাতে কোনোভাবেই ইলেকট্রনিক ডিভাইসের মাধ্যমে জালিয়াতি করা না যায়।
অধিকতর স্বচ্ছতার জন্য বিকল্প প্রস্তাবনা (প্রয়োজনে প্রয়োগযোগ্য):
যদি স্থানীয় প্রভাবে দুর্নীতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে:
আমাদের প্রধান দাবি: সকল চাকরির পরীক্ষা জেলা শহরে নিতে হবে
একজন বেকার প্রার্থীর পক্ষে প্রতি সপ্তাহে ঢাকায় গিয়ে পরীক্ষা দেওয়া আর্থিক ও মানসিকভাবে অসম্ভব। এমনকি মেয়েদের ক্ষেত্রে একা একা ঢাকায় গিয়ে প্রতিনিয়ত পরীক্ষা দেওয়া অনেক কষ্টের। এছাড়া নিরাপত্তার ঝুকি এবং পারিবারিক চাপ তো আছেই। তাই অবিলম্বে সকল চাকরির পরীক্ষা নিজ জেলা শহরে অথবা বিভাগীয় শহরে বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। উপরের নিয়ম গুলো ফলো করে জেলা শহরে পরীক্ষা নিলে কোন সমস্যা হবে না।
ভোটের গুরুত্ব আছে, এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু একটি জাতির মেরুদণ্ড হলো তার যুবসমাজ। ভোট দিয়ে হয়তো সরকার পরিবর্তন করা যায়, কিন্তু স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া না থাকলে রাষ্ট্রের কাঠামো পরিবর্তন করা যায় না।
৭১ কোটি টাকা দিয়ে ভোটের সিসিটিভি কেনা সম্ভব হলে, বেকারদের মেধা বাঁচাতে পরীক্ষার হলে জ্যামার বসানো অসম্ভব হওয়ার কথা নয়। ‘জুলাইয়ের কারিগর’রা সরকারের কাছে করুণা চায় না, চায় তাদের মেধার সঠিক মূল্যায়ন ও নিরাপত্তা। সরকার যদি এখনই পরীক্ষার হলের দুর্নীতি রোধে কঠোর পদক্ষেপ না নেয়, তবে এই বেকারদের দীর্ঘশ্বাস একসময় বড় কোনো ঝড়ের পূর্বাভাস হতে পারে।
আমাদের এই আন্দোলন কেবল ফেসবুকে লাইক দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। আমাদের আওয়াজ পৌঁছাতে হবে নীতিনির্ধারকদের কানে। তাই এখনই যুক্ত হোন আমাদের মূল প্ল্যাটফর্মে:
আন্দোলন ও আলোচনার জন্য ফেসবুক গ্রুপ:
https://www.facebook.com/groups/824139897276763
(গ্রুপে জয়েন করে আপনার মতামত, পরামর্শ এবং পরিস্থিতি তুলে ধরুন)