সকল সরকারি চাকরির তথ্য সবার আগে মোবাইলে নোটিফিকেশন পেতে ডাউনলোড করুন
Android App: Jobs Exam Alert

আজকে অনুষ্ঠিত প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে প্রশ্নফাঁসের যে গুঞ্জন ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এবং পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা চলছে। তবে আবেগের বশবর্তী না হয়ে বাস্তবসম্মত ও কারিগরি দৃষ্টিকোণ থেকে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই সমস্যার ধরন প্রথাগত "প্রশ্নফাঁস" থেকে কিছুটা ভিন্ন।

প্রশ্নফাঁসের প্রকৃত সময়কাল ও ধরন

সাধারণত "প্রশ্নফাঁস" বলতে আমরা বুঝি পরীক্ষা শুরুর আগের রাতে বা কয়েক ঘণ্টা আগে প্রশ্ন বাইরে চলে আসা। কিন্তু এবারের প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার ক্ষেত্রে দৃশ্যপটটি ভিন্ন। প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:

  • পরীক্ষা চলাকালীন ফাঁস: প্রশ্নপত্র মূলত কেন্দ্রের ভেতরে প্রবেশ করার পর এবং পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর বাইরে এসেছে।
  • ডিভাইসের ব্যবহার: ফেসবুক বা অন্যান্য মাধ্যমে যেসব প্রশ্নের ছবি দেখা গেছে, তা পরীক্ষা চলাকালীন সময়েই তোলা। যাদের আটক করা হয়েছে, তাদের অধিকাংশই ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহারের মাধ্যমে জালিয়াতির চেষ্টা করছিল।
  • পূর্বের রাতে ফাঁস হয়নি: পরীক্ষা শুরুর আগে প্রশ্ন হুবহু বাইরে এসেছে—এমন কোনো শক্ত প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ, প্রথাগত অর্থে প্রশ্ন আগে থেকে ফাঁস হয়নি।

প্রশাসনের সীমাবদ্ধতা ও কেন্দ্রের বাস্তবতা

প্রশ্ন হলো, প্রশাসন কেন এই জালিয়াতি আটকাতে পারল না? এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের পরীক্ষা পদ্ধতির বিশালতা ও বর্তমান কাঠামোর মধ্যে।

১. কেন্দ্রের বিশাল সংখ্যা: সারা বাংলাদেশে হাজার হাজার কেন্দ্রে একযোগে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এত বিশাল কর্মযজ্ঞে প্রতিটি কেন্দ্রের প্রতিটি কক্ষ শতভাগ নিশ্ছিদ্র রাখা প্রশাসনের একার পক্ষে প্রায় অসম্ভব। ২. অসৎ চক্রের সম্পৃক্ততা: অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, পরীক্ষা কেন্দ্রে দায়িত্বরত কিছু অসাধু শিক্ষক এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান প্রধানের যোগসাজশেই প্রশ্নপত্রের ছবি বাইরে আসে। যখন রক্ষকই ভক্ষক হয়ে দাঁড়ায়, তখন কেন্দ্রীয় প্রশাসনের পক্ষে তা নিয়ন্ত্রণ করা দুরূহ হয়ে পড়ে। ৩. মানবিক সীমাবদ্ধতা: হাজার হাজার শিক্ষকের মধ্যে গুটিকয়েক দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তি থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। এই সামান্য অংশের অসততার দায় পুরো সিস্টেমকে বহন করতে হয়।

বর্তমান পদ্ধতির দুর্বলতা: প্রযুক্তির অভাব

 বর্তমান পদ্ধতিতে ১০০% স্বচ্ছ পরীক্ষা নেওয়া অসম্ভব। 

কারণ:

  • ম্যানুয়াল বা প্রচলিত পদ্ধতিতে দেহ তল্লাশি করে ক্ষুদ্রাকৃতির ব্লুটুথ ডিভাইস বা স্মার্টওয়াচ আটকানো কঠিন।
  • যতবারই এই সনাতন পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেওয়া হবে, ততবারই অসৎ চক্র প্রযুক্তির অপব্যবহার করে প্রশ্ন বাইরে পাঠাবে।

সমাধানের পথ: প্রযুক্তির বিপরীতে প্রযুক্তি

যদি আমরা সত্যিকার অর্থেই শতভাগ স্বচ্ছ ও প্রশ্নফাঁসমুক্ত পরীক্ষা চাই, তবে কেবল সদিচ্ছাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন প্রযুক্তির কঠোর প্রয়োগ।

  • ফ্রিকোয়েন্সি জ্যামার (Frequency Jammer): পরীক্ষার হলে মোবাইল নেটওয়ার্ক বা ব্লুটুথ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে জ্যামার ব্যবহার করা এখন সময়ের দাবি। এটি ছাড়া প্রশ্নপত্রের ডিজিটাল পাচার রোধ করা অসম্ভব।
  • ডিজিটাল মনিটরিং: প্রতিটি কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা এবং মেটাল ডিটেক্টরের কঠোর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্রের ছবি যে বাইরে এসেছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে এটি প্রশাসনের ব্যর্থতার চেয়ে বেশি আমাদের সিস্টেমের দুর্বলতা এবং কিছু ব্যক্তির নৈতিক অবক্ষয়ের ফল। প্রশ্নটি পরীক্ষা শুরুর আগে ফাঁস হয়নি, বরং পরীক্ষা চলাকালীন অসদুপায়ে বাইরে পাঠানো হয়েছে।

ভবিষ্যতে এ ধরনের জালিয়াতি বা "ডিজিটাল প্রশ্নফাঁস" রোধ করতে হলে সনাতন পদ্ধতির পরিবর্তন আবশ্যিক। প্রযুক্তির ব্যবহার এবং জ্যামার নিশ্চিত করা ছাড়া হাজার চেষ্টা করেও এই বিশাল নিয়োগ পরীক্ষায় ১০০% স্বচ্ছতা আনা সম্ভব হবে না। এখনই সময় পরীক্ষা পদ্ধতিকে আধুনিকায়নের পথে নিয়ে যাওয়ার।