সকল সরকারি চাকরির তথ্য সবার আগে মোবাইলে নোটিফিকেশন পেতে ডাউনলোড করুন
Android App: Jobs Exam Alert

বাংলাদেশের লাখো বেকার যুবকের স্বপ্ন আর দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের নাম 'চাকরির পরীক্ষা'। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই স্বপ্ন বারবার দুঃস্বপ্নে পরিণত হচ্ছে প্রশ্নফাঁস এবং ডিজিটাল জালিয়াতির কারণে। অথচ প্রযুক্তির এই যুগে সামান্য কিছু অর্থ ব্যয় এবং সুনির্দিষ্ট তিনটি পদক্ষেপ গ্রহণ করলেই এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। প্রশ্ন হলো—কর্তৃপক্ষ কি আসলেই সমাধানের পথ খুঁজছে, নাকি এই অনিয়ম জিইয়ে রেখে শিক্ষার্থীদের সাথে তামাশা করা হচ্ছে?

প্রতিটি নিয়োগ পরীক্ষায় চাকরির পরীক্ষার্থীর ফি নেওয়া হয়। অথচ পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখনো সেই এনালগ আমলেই রয়ে গেছে। ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে প্রশ্ন পরিবহণ এবং পরীক্ষা কেন্দ্রে প্রযুক্তির ব্যবহার না থাকায় অসাধু চক্র সহজেই প্রশ্ন ফাঁস বা ডিভাইসের মাধ্যমে নকল করার সুযোগ পাচ্ছে।

প্রশ্নফাঁস হয় মূলত ৩টি জায়গা থেকেঃ

পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, প্রশ্ন প্রণয়ন থেকে পরীক্ষার্থীর টেবিল পর্যন্ত পৌঁছানোর পুরো প্রক্রিয়ায় তিনটি ধাপে নিরাপত্তার বড় অভাব রয়েছে:

১. প্রশ্ন প্রণয়ন ও প্রিন্টিং প্রেস (উৎপত্তিস্থল) প্রশ্নফাঁসের প্রথম এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান হলো বিজি প্রেস বা যেখানে প্রশ্ন ছাপা হয়। এখানে প্রশ্ন কম্পোজ করা, প্রুফ দেখা এবং ছাপানোর কাজে অনেক মানুষ জড়িত থাকে।

  • সমস্যা: নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঢিলেঢালা হলে এখানকার অসাধু কর্মচারী বা কর্মকর্তারা প্রশ্নের কপি বা ছবি বাইরে পাচার করে দেয়। এখান থেকে প্রশ্ন বের হলে তা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে।

২. ব্যবস্থাপনা ও বিতরণ প্রক্রিয়া (মধ্যস্বত্বভোগী)প্রেস থেকে জেলা বা উপজেলা ট্রেজারিতে প্রশ্ন পাঠানোর সময় এবং ট্রেজারি থেকে কেন্দ্রে নেওয়ার পথে একদল অসাধু কর্মকর্তা বা 'ম্যানেজমেন্ট' জড়িত থাকে।

  • সমস্যা: যারা প্রশ্ন পরিবহণ বা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকেন, তাদের যোগসাজশে সিলগালা করা খাম কৌশলে খুলে প্রশ্নের ছবি তোলা হয়। অনেক সময় রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে এই স্তরে প্রশ্নফাঁস করা হয়।

৩. পরীক্ষা কেন্দ্র (শেষ ধাপ)প্রশ্নফাঁসের চূড়ান্ত ধাপটি ঘটে পরীক্ষার দিন সকালে, খোদ পরীক্ষা কেন্দ্রে।

  • সমস্যা: পরীক্ষা শুরুর ৩০-৪০ মিনিট আগে কেন্দ্র সচিবের কক্ষে প্রশ্ন খোলার নিয়ম থাকলেও, অনেক কেন্দ্রে আরও আগে প্রশ্ন খোলা হয়। এরপর স্মার্টফোনে ছবি তুলে বাইরে পাঠানো হয় এবং দ্রুত সমাধান করে ডিভাইসের মাধ্যমে পরীক্ষার্থীদের কাছে উত্তর পৌঁছে দেওয়া হয়।

সমাধান হাতের মুঠোয়: ৩টি কার্যকরী পদক্ষেপ

এই  তিনটি পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করলেই প্রশ্নফাঁস ও জালিয়াতির ৯০% রোধ করা সম্ভব। পদক্ষেপগুলো টেকনিক্যাল দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা হলো:

১. প্রশ্ন প্রণয়ন ও মডারেশন প্যানেলের কঠোর নিরাপত্তাপ্রশ্নফাঁসের অন্যতম উৎস হলো প্রশ্ন তৈরির স্থান বা প্রেস। এখানে নিরাপত্তা জোরদার করা সবচেয়ে জরুরি।

  • আইসোলেশন: যারা প্রশ্ন করবেন এবং টাইপ করবেন, পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের সম্পূর্ণ বাহ্যিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন (Quarantine) রাখতে হবে।
  • নজরদারি: প্রশ্ন প্রণয়ন কেন্দ্রে সার্বক্ষণিক সিসিটিভি এবং গোয়েন্দা নজরদারি থাকতে হবে যাতে ডিজিটাল বা ফিজিক্যাল কোনোভাবেই তথ্য বাইরে না যায়।

২. ডিজিটাল বক্স ও স্মার্ট প্রশ্ন বিতরণ পদ্ধতি এনালগ খামে প্রশ্ন পরিবহণই বর্তমানে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এর সমাধান হতে পারে 'IoT (Internet of Things) ভিত্তিক ডিজিটাল বক্স'।

  • প্রযুক্তি: প্রশ্নপত্রগুলো একটি বিশেষ ধাতু বা ফাইবারের তৈরি ডিজিটাল বক্সে লক করা থাকবে।
  • কার্যপদ্ধতি: এই বক্সের লক খোলার পাসওয়ার্ড বা এক্সেস শুধু কেন্দ্রীয় সার্ভার থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। পরীক্ষা শুরুর ঠিক ৫ মিনিট আগে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বা পরীক্ষার্থীদের সামনেই পাসওয়ার্ড দিয়ে বক্সটি খোলা হবে। এর আগে এটি ভাঙা বা খোলার চেষ্টা করলে কেন্দ্রে এলার্ম বেজে উঠবে এবং কেন্দ্রীয় সার্ভারে সংকেত চলে যাবে।

৩. জ্যামার প্রযুক্তির বাধ্যতামূলক ব্যবহার বর্তমানে 'ডিভাইস পার্টি' বা ব্লুটুথ ইয়ারফোন ব্যবহার করে জালিয়াতি একটি মহামারী আকার ধারণ করেছে। এর একমাত্র সমাধান 'সিগন্যাল জ্যামার'।

  • খরচ বনাম কার্যকারিতা: একটি পোর্টেবল জ্যামারের বাজারমূল্য খুব বেশি নয়। প্রতিটি কেন্দ্রে পরীক্ষার্থীর সংখ্যার অনুপাতে বা প্রতিটি ফ্লোরে জ্যামার বসালে মোবাইল নেটওয়ার্ক, ব্লুটুথ এবং ওয়াইফাই কাজ করবে না।
  • ফলাফল: বাইরে থেকে প্রশ্নের উত্তর বলে দেওয়া বা ইন্টারনেট ব্যবহার করে নকল করা শতভাগ বন্ধ হবে।

কেন তবে বাস্তবায়ন হচ্ছে না?

১. সিন্ডিকেট বাণিজ্য: প্রশ্নফাঁস এবং জালিয়াতির সাথে হাজার কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য জড়িত। নিরাপত্তা ব্যবস্থা কঠোর হলে এই সিন্ডিকেট বন্ধ হয়ে যাবে। 

২. উদাসীনতা: যারা নীতিনির্ধারক, তাদের জবাবদিহিতার অভাব।চাকরির শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি তাদের স্পর্শ করে না। 

৩. দক্ষতার অভাব: প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে নীতিনির্ধারকদের জ্ঞানের অভাব বা আধুনিক সলিউশন গ্রহণে অনীহা।

প্রশ্নফাঁস কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এটি মানবসৃষ্ট অপরাধ। জ্যামার বসানো, ডিজিটাল বক্স ব্যবহার করা বা প্রশ্ন প্রণয়নকারীদের নজরদারিতে রাখা—এগুলো রকেট সায়েন্স নয়। শিক্ষার্থীদের টাকায় পরীক্ষার আয়োজন করে শিক্ষার্থীদের সাথেই এই তামাশা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। কর্তৃপক্ষের মাথায় বুদ্ধির অভাব নেই, অভাব শুধু সততা আর মেরুদণ্ডের। আজই এই প্রযুক্তিগুলো প্রয়োগ করলে কাল থেকেই একটি স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া উপহার দেওয়া সম্ভব।