প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে কোটা তুলে দেওয়ার কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেছেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কোটা অবশ্যই থাকবে। কারণ তাঁদের জন্যই আমরা স্বাধীন দেশ পেয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘১৯৭২ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কোটার ব্যবস্থা করা হয়। যাঁদের জন্য কোটা করেছি তাঁরাই যদি না চান তবে রাখার দরকার কী। কেবিনেট সেক্রেটারির মাধ্যমে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। সেখানেই ঠিক হবে। এরপর যদি মফস্বলের কেউ চাকরি না পায় তখন আমাদের কেউ দায়ী করতে পারবে না।’

গতকাল বুধবার রাতে জাতীয় সংসদ অধিবেশনে ২০১৮-১৯ সালের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনার সমাপনীতে অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অধিবেশনে তিনি মাদকের বিরুদ্ধে তাঁর সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির কথা পুনরুল্লেখ করে বলেন, ‘সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ-মাদকের বিরুদ্ধে আমরা অভিযান চালিয়ে যাচ্ছি। আমাদের অভিযান অব্যাহত রাখব, যে যাই বলুক তাতে কিছু আসে যায় না। দেশকে আমরা মাদকমুক্ত করবই।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, টানা দুবার ক্ষমতায় আসতে পেরেছি বলেই সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড দৃশ্যমান হয়েছে, জনগণ তার সুফল পাচ্ছে। দেশের মানুষের সার্বিক কল্যাণের কথা চিন্তা করেই এই বাজেট দেওয়া হয়েছে। দেশ কতটুকু এগিয়ে যাবে, মানুষের জীবনমানের কতটুকু উন্নয়ন ঘটবে সেটি বিবেচনা করেই বাজেট দেওয়া হয়। তিনি বলেন, হঠাৎ করে উড়ে এসে জুড়ে বসে, তারা নিজেদের ভাগ্য গড়ে, দুর্নীতি করে, এলিট শ্রেণি তৈরি করে অবৈধভাবে ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করে। তারা জনগণের কোনো চিন্তা করে না, উন্নয়নও করতে পারে না। সেটা দেশের জনগণ কখনো ভুলে যাবে না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটানা সাড়ে ৯ বছর ক্ষমতায় আছি বলেই উন্নয়ন প্রকল্পগুলো আজ দৃশ্যমান। বিএনপি আমলের ৬১ হাজার টাকার বাজেট আজ চার লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকার বাজেট দিতে সক্ষম হয়েছি। বিএনপি আমলের ১৯ হাজার উন্নয়ন বাজেট ছিল, আমরা এবার এক লাখ ৭৩ হাজার এডিপি দিতে পেরেছি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জিয়া-এরশাদ-খালেদা জিয়া সরকাররা বাজেট দেওয়ার আগে বিদেশের কাছে ধরনা দিত। এ ছাড়া বাজেটই হতো না। আমরা ৯০ ভাগ নিজস্ব অর্থায়নে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের সক্ষমতা অর্জন করেছি।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমার দৃঢ় বিশ্বাস এবার জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭.৮ শতাংশে উন্নীত হবে। প্রতিবার ৭ শতাংশের ওপর প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি করা অত সহজ ছিল না। আমরা আর স্বল্পোন্নত নেই, উন্নয়নশীল দেশে পদার্পণ করেছি। ভারত, চীন, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইনের মতো শক্তিশালী অর্থনৈতিক দেশের কাতারে রয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘মানবিক কারণে আমরা ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছি। ছোট একটা ভূখণ্ডে বিশাল জনগোষ্ঠীর দেশে এত উন্নয়ন কিন্তু কম কথা নয়।’

সরকারপ্রধান বলেন, বাংলাদেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। ৫০ লাখ অসহায় মানুষকে আমরা বিনা মূল্যে খাবার পৌঁছে দিচ্ছি। মত্স্য উৎপাদনেও আমরা প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। আমরা বিনা মূল্যে ছাত্রছাত্রীদের বই দিচ্ছি। আমরা চাই না দেশের একটি মানুষও গৃহহারা থাকুক। আমরা সব মানুষকে ঘরবাড়ি দেব।’ তিনি বলেন, ‘শুধু একটি বছরের নয়, আমরা এক শ বছরের উন্নয়নের ডেল্টা প্ল্যান নিয়েছি। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য রেখে কাজ করছি, দেশটাকে উন্নত করার জন্য যা যা করার তার সবই করছি। আমরা সমুদ্রতল থেকে মহাকাশ জয় করেছি। স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করে মহাকাশে চলে গিয়েছি। আমরা কোথাও পিছিয়ে নেই।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের কলাকৌশল আমরা বুঝে গেছি, সে জন্য জিনিসপত্রের দাম বাড়াতে পারছে না। মূল্যস্ফীতি কখনো আমাদের সময় বাড়েনি। মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যেই দ্রব্যমূল্যে রাখতে পেরেছি। আর দেশের মানুষের স্বার্থেই আমরা কৃষি ও বিদ্যুতে ভর্তুকি দিচ্ছি। উৎপাদনের মূল্যে থেকে আমরা কম মূল্যে জনগণকে বিদ্যুৎ দিচ্ছি।’

পদ্মা সেতু প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পদ্মা সেতুর কাজ কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকার করেনি। স্বাধীনতার পর জাপানে এই সেতু নির্মাণের প্রাথমিক উদ্যোগ গ্রহণ হয়। জিয়া এসে বন্ধ করে দেয়। খালেদা জিয়াও বন্ধ করে রাখে। আমরা ক্ষমতায় এসে পদ্মা সেতুতে শুধু সড়ক নয়, রেলপথও নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেই। দুর্নীতির অভিযোগ চ্যালেঞ্জ দিয়ে জিতেছি, নিজস্ব অর্থায়নেই আমরা পদ্মা সেতু করছি। আরো সহজে সেতুটি করতে পারতাম। ফ্ল্যাট ডিজাইনে হলে দ্রুত হতো, কিন্তু আমরা দোতলা সেতু করছি বলেই একটু সময় লাগছে। আমাদের পরিকল্পনা হচ্ছে, পদ্মা সেতু হয়ে পায়রা বন্দর পর্যন্ত রেললাইন করব। তিনি বলেন, যমুনা সেতু করতে গিয়ে জমি অধিগ্রহণে দেড় গুণ দিতে হতো, পদ্মা সেতুতে তিন গুণ দিতে হচ্ছে। এ জন্য প্রকল্পের টাকা বেশি লাগছে।

সূত্রঃ  কালের কণ্ঠ