জার্মানি যাওয়ার কথা ভাবলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে লাখ লাখ টাকার চুক্তি আর দালালের দৌরাত্ম্য। কিন্তু আপনি কি জানেন, জার্মান সরকার নিজেই বিদেশি দক্ষ কর্মীদের চাকরি খুঁজে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছে? কোনো থার্ড পার্টি এজেন্সি বা দালাল ছাড়া, সরাসরি জার্মান ফেডারেল এমপ্লয়মেন্ট এজেন্সির আন্তর্জাতিক বিভাগ (ZAV)-এর মাধ্যমে আপনি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এবং বৈধ উপায়ে জার্মানির ওয়ার্ক ভিসা পেতে পারেন।
কীভাবে আবেদন করবেন? খরচ কত? যোগ্যতা কী লাগবে? আজকের এই আর্টিকেলে থাকছে তার বিস্তারিত গাইডলাইন।
ZAV (Zentrale Auslands- und Fachvermittlung) কী?
ZAV হলো জার্মানির ‘ফেডারেল এমপ্লয়মেন্ট এজেন্সি’ (Bundesagentur für Arbeit)-এর একটি বিশেষ শাখা। সহজ কথায়, এটি জার্মানির সরকারি জব প্লেসমেন্ট সার্ভিস। এদের মূল কাজ হলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে দক্ষ কর্মী (Skilled Workers) খুঁজে এনে জার্মান কোম্পানিগুলোর সাথে সংযোগ ঘটিয়ে দেওয়া।
সবচেয়ে বড় সুবিধা: ZAV-এর মাধ্যমে চাকরি খোঁজার জন্য আপনাকে এক টাকাও ফি দিতে হবে না। এটি সম্পূর্ণ সরকারি এবং ফ্রি সার্ভিস।
কেন ZAV-এর মাধ্যমে আবেদন করবেন?
১. ১০০% বিশ্বস্ত ও সরকারি: প্রতারণার কোনো সুযোগ নেই।
২. বিনামূল্যে সেবা: কোনো এজেন্সিকে সার্ভিস চার্জ দিতে হয় না।
৩. সরাসরি নিয়োগ: মাঝখানের কোনো মাধ্যম ছাড়াই সরাসরি জার্মান কোম্পানির সাথে ইন্টারভিউয়ের সুযোগ।
৪. ভিসা প্রসেসিং সহজ: সরকারি মাধ্যমের অফার লেটার থাকায় জার্মান অ্যাম্বাসিতে ভিসা পাওয়া অনেক সহজ হয়ে যায়।
আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা
ZAV-এর মাধ্যমে আবেদন করতে হলে আপনার কিছু নির্দিষ্ট যোগ্যতা থাকতে হবে:
-
শিক্ষাগত যোগ্যতা: ন্যূনতম ব্যাচেলর ডিগ্রি বা ৩ বছরের কারিগরি ডিপ্লোমা (Vocational Training)।
-
কাজের অভিজ্ঞতা: সংশ্লিষ্ট ফিল্ডে অন্তত ২-৩ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা।
-
ভাষা: ইংরেজি ভাষায় ভালো দক্ষতা থাকতে হবে। তবে জার্মান ভাষা (লেভেল B1/B2) জানা থাকলে চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা ৮০% বেড়ে যায়।
-
ডিমান্ডিং সেক্টর: আইটি, ইঞ্জিনিয়ারিং, নার্সিং, হসপিটালিটি এবং টেকনিক্যাল কাজের চাহিদা সবচেয়ে বেশি।
ধাপে ধাপে আবেদন প্রক্রিয়া (Step-by-Step Guide)
বাংলাদেশ থেকে আবেদন করার সঠিক নিয়ম নিচে দেওয়া হলো:
ধাপ ১: সিভি ও কভার লেটার তৈরি
সাধারণ সিভি এখানে চলবে না। আপনাকে অবশ্যই Europass Format-এ সিভি এবং কভার লেটার তৈরি করতে হবে। সিভিতে আপনার কাজের অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতার বিস্তারিত বর্ণনা থাকতে হবে।
ধাপ ২: ZAV-এর সাথে যোগাযোগ
আপনার সিভি এবং কভার লেটারটি ZAV-এর অফিশিয়াল ইমেইল ঠিকানায় পাঠাতে হবে।
-
অফিশিয়াল ইমেইল:
zav@arbeitsagentur.deঅথবাmake-it-in-germany@arbeitsagentur.de -
সাবজেক্ট লাইন: Application for employment as [আপনার পদের নাম] – [আপনার নাম]
ইমেইলে বডিতে লিখবেন যে আপনি একজন দক্ষ কর্মী এবং জার্মানিতে কাজ করতে আগ্রহী।
ধাপ ৩: প্রোফাইল যাচাই ও ইন্টারভিউ
আপনার প্রোফাইল যদি জার্মান জব মার্কেটের সাথে মিলে যায়, তবে ZAV আপনাকে একটি ফর্ম পাঠাবে অথবা সরাসরি আপনার প্রোফাইল তাদের ডাটাবেসে রাখবে। যখনই কোনো কোম্পানি আপনার মতো কর্মী খুঁজবে, ZAV আপনার সিভি সেখানে ফরোয়ার্ড করবে। কোম্পানি আগ্রহী হলে আপনার সাথে অনলাইন ইন্টারভিউ নেবে।
ধাপ ৪: জব অফার ও কন্ট্রাক্ট
ইন্টারভিউ সফল হলে কোম্পানি আপনাকে অফিশিয়াল জব অফার বা কন্ট্রাক্ট পেপার পাঠাবে।
ধাপ ৫: ভিসার আবেদন
জব অফার হাতে পাওয়ার পর ঢাকার জার্মান অ্যাম্বাসিতে ‘Skilled Worker Visa’-র জন্য আবেদন করবেন।
খরচ কত? (Real Cost Breakdown)
অনেকেই ভাবেন ইউরোপ মানেই লাখ লাখ টাকার খেলা। কিন্তু সরকারি উপায়ে গেলে খরচ খুবই কম।
| খাতের নাম | আনুমানিক খরচ (টাকায়) | মন্তব্য |
| ZAV সার্ভিস চার্জ | ০ টাকা | সরকারিভাবে সম্পূর্ণ ফ্রি |
| ভিসা ফি | ৭৫ ইউরো (≈ ১০,০০০ টাকা) | অ্যাম্বাসিতে দিতে হয় |
| ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশন/নোটারি | ৫,০০০ – ১০,০০০ টাকা | শিক্ষাগত সনদ সত্যায়ন |
| বিমান ভাড়া | ৬০,০০০ – ৮০,০০০ টাকা | ভিসা পাওয়ার পর |
| হেলথ ইনস্যুরেন্স | ৫,০০০ – ১০,০০০ টাকা | ট্রাভেল ইনস্যুরেন্স |
মোট খরচ: আপনি যদি নিজে সব করেন, তবে বিমান ভাড়াসহ ১ থেকে ১.৫ লাখ টাকার মধ্যেই আপনি জার্মানি পৌঁছাতে পারবেন। যেখানে দালালের মাধ্যমে গেলে ১৫-২০ লাখ টাকা লাগে।
গুরুত্বপূর্ণ টিপস (সফল হওয়ার জন্য)
১. জার্মান ভাষা শিখুন: এটিই আপনার সবচেয়ে বড় যোগ্যতা। অন্তত A2 বা B1 লেভেল শেষ করুন।
২. প্রফেশনাল সিভি: আপনার সিভিটি যেন আন্তর্জাতিক মানের হয়। বানান ভুল বা অগোছালো সিভি সরাসরি বাতিল হয়ে যায়।
৩. ধৈর্য ধরুন: সরকারি প্রক্রিয়া কিছুটা সময়সাপেক্ষ। ইমেইল করার পর উত্তর পেতে ১-২ সপ্তাহ বা তার বেশি সময় লাগতে পারে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন: আমি কি স্টুডেন্ট ভিসা ছাড়া সরাসরি জবে যেতে পারব?
উত্তর: হ্যাঁ, আপনার যদি প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা থাকে, তবে ZAV-এর মাধ্যমে সরাসরি ওয়ার্ক পারমিট নিয়েই যেতে পারবেন।
প্রশ্ন: আমার বয়স কত হতে হবে?
উত্তর: সাধারণত ১৮-৪৫ বছরের মধ্যে হলে ভালো হয়। তবে দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে শিথিলযোগ্য।
সতর্কবার্তা: মনে রাখবেন, ZAV কখনো আপনার কাছে চাকরির জন্য টাকা চাইবে না। কেউ যদি ZAV-এর নাম করে টাকা চায়, বুঝবেন সেটি প্রতারণা।
জার্মানি যাওয়ার স্বপ্ন পূরণ হোক বৈধ ও সঠিক পথে। আজই আপনার সিভি আপডেট করুন এবং ZAV-তে মেইল করুন!