বাঙালিদের মেধা থাকা সত্ত্বেও একাত্তরপূর্ব পাকিস্তানে সরকারি চাকরিতে অধিকাংশ নিয়োগ দেওয়া হতো পশ্চিম পাকিস্তান থেকে। বাঙালিদের নানা দিক থেকে বৈষম্যমূলকভাবে ঠেঙাতেই পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ছিল করিত্কর্মা। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয় বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রধান শক্তি ছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্য ও অবিচার মেনে না নেওয়া সংগঠিত জনগোষ্ঠী। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৪ বছর পরও বিসিএসসহ অধিকাংশ বেসামরিক চাকরিতে ৫৬ শতাংশ কোটা আর একটি বৈষম্য সৃষ্টি করেছে। এদের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা-সংক্রান্ত কোটায়

৩০ শতাংশ, মহিলা কোটায় ১০ শতাংশ, জেলা কোটায় ১০ শতাংশ, উপজাতি কোটায় পাঁচ শতাংশ এবং প্রতিবন্ধী কোটায় এক শতাংশ নিয়োগের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে ৫৫ শতাংশ কোটা হতে প্রাধিকারের ভিত্তিতে প্রতিবন্ধী কোটায় এক শতাংশ বণ্টন করা হয়। তাছাড়া বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয় মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাও। ফলে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা। বিদ্যমান কোটা নামক বৈষম্যের ফলে একদিকে যেমন মেধাবীরা হাপিত্যেশ করছে অন্যদিকে তুলনামূলক কম যোগ্যতাসম্পন্ন কোটাধারীদের বসানো হচ্ছে জনপ্রশাসনসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে। তাছাড়া বিদ্যমান কোটার সাথে দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতি যোগ করলে আপামর মেধাবীদের জন্য চাকরি ষোল আনাই মিছে! আর কোটা নিয়ে চলছে মধুর রাজনীতি। ৩৪তম বিসিএস প্রিলিমিনারি ফলাফল পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, কোটা নিয়ে যারা সহিংস আন্দোলন করছে তাদের পিএসসি-র অধীনে কোনো চাকরি হবে না। আর সেই সুযোগে বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, ‘আগামী দিনে চাকরি হবে মেধার ভিত্তিতে’। উভয় সরকারই বেকারদের আবেগকে কাজে লাগান ভোট প্রাপ্তির আশায়। যেমনটা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন জোট সরকার ‘ঘরে ঘরে চাকরি’ দেওয়ার নির্বাচনী ইশতিহার দিয়ে ভোটের ফাঁদ পেতেছিলেন। অভাগা যেদিকে যায় সাগর শুকিয়ে যায়। সরকার আসে সরকার যায়, কিন্তু মেধার প্রকৃত মূল্যায়ন হয় না। সব সরকারের মধ্যেই কেমন জানি একটা অস্বাভাবিক স্বাভাবিক ভাব। বিষয়টি ‘স্পর্শকাতর’ বিবেচনায় কোনো সরকারই কোটাব্যবস্থার সংস্কার করে না। এ অবস্থা চলতে থাকলে সুদূর নয়, নিকট ভবিষ্যতেই দেশ মেধাশূন্য হয়ে পড়বে। ক্রিকেটে কোটা না থাকায় বাংলাদেশের ক্রিকেট তরতরিয়ে উপরে উঠে যাচ্ছে, আর আমরা পেয়েছি বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব-আল-হাসানকে। সামরিক চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা না থাকার কারণেই আমাদের সেনাবাহিনী সারাবিশ্বে সুনাম কুড়িয়েছে। যার কারণেই জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী সবচেয়ে বেশি এবং সবচেয়ে দক্ষ। তাহলে কোটা ব্যবস্থা সংস্কার করে প্রজাতন্ত্রের কর্মে অধিকতর মেধাবীদের নিয়োগ দিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে দোষ কোথায়? এগারো জন ক্রিকেটার যদি দেশটাকে বিশ্ব দরবারে পরিচিত করিয়ে দিতে পারে তবে আমরা সবাই মিলে কি দেশটাকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে পারব না? কেউ প্রায় ৫০ শতাংশ নম্বর পেয়ে পরীক্ষায় উতরে যাবে, আর কেউ প্রায় ৮০ শতাংশ পেয়েও টিকবে না তা মেনে নেওয়া যায় না। ৫০ শতাংশ নম্বর পাওয়া যত সহজ ৮০ শতাংশ পাওয়া ততো কঠিন। ৮০ শতাংশ নম্বর পেতে যে কাউকেই মেধাবী হতে হয়। কোটা অবশ্যই দরকার আছে, তবে তা অবশ্যই ৫৬ শতাংশ নিশ্চয় নয়। তাছাড়া বিদ্যমান কোটা পদ্ধতিতে শুধুমাত্র শিক্ষিত কোটাধারীরাই সুবিধা পাচ্ছেন, অশিক্ষিত বা কম শিক্ষিত কোটাধারীরা কোটার সুবিধা পাচ্ছেন না। বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের ছেলে শওকতের মতো অনেককেই দিনাতিপাত করতে হয় চায়ের দোকানে পানি টেনে। তাই সকল কোটাধারীর সুষম সুবিধার কথা মাথায় রেখে এবং মেধাবীদের প্রজাতন্ত্রের কর্মে সুযোগদানের নিমিত্তে বাস্তবতার নিরিখে বিদ্যমান কোটা পদ্ধতির সংস্কার প্রয়োজন। এক্ষেত্রে পিটার ড্রাকারকে উদ্ধৃত করা যায়, ‘সঠিক কাজটি করা’ ‘সঠিকভাবে কাজটি করা’-র চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সবচেয়ে ভালো হয় সঠিক কাজটি যদি সঠিকভাবে করা যায়।

 

 লেখক :শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

 

mijanlawjnu@gmail.com

Like Our Education page